জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে জওহরলাল নেহেরুর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য ও নির্ধারক। ১৯৪৬ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর, স্বাধীনতার পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তিনি ঘোষণা করেন যে ভারত সকল প্রকার সামরিক ও রাজনৈতিক জোটের বাইরে থাকবে। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ার নবস্বাধীন রাষ্ট্রগুলির এক সম্মেলনে তিনি ঐ দেশগুলিকে নিয়ে সম্মিলিত জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যেই একটি কার্যকর মঞ্চ গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখেন। নেহেরু সেই সম্মেলনে বলেন, “এশিয়ার সকল দেশকে সমান ভিত্তিতে এক সাধারণ উদ্দেশ্য ও প্রচেষ্টায় একত্রিত হতে হবে।”
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে জোটনিরপেক্ষ নীতির মূল স্থপতি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে ভারত সকল সামরিক-রাজনৈতিক গোষ্ঠী থেকে মুক্ত থাকবে এবং সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। নেহেরু বিশ্বাস করতেন যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেই বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি দেশের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে, জোট নিরপেক্ষ নীতির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পারস্পরিক শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্ব রক্ষা, বৈশ্বিক সহযোগিতা ও সহাবস্থান, উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামে সমর্থন এবং বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতা ইত্যাদি নীতির সমন্বয়ে একটি গতিশীল ও ইতিবাচক পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেছিল।
১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই-এর ভারত সফরের সময় পঞ্চশীল বা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থনের পাঁচ নীতি গৃহীত হয়। এই নীতিকে ভিত্তি করে নেহেরু এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথভাবে একটি জোটনিরপেক্ষ কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
নেহেরুর ভূমিকা কেবল তাত্ত্বিক ছিল না, বাস্তব পদক্ষেপেও তা প্রতিফলিত হয়। তিনি ১৯৫৫ সালের ঐতিহাসিক বান্দুং সম্মেলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, যা এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলির প্রথম বৃহৎ সম্মেলন ছিল। এই সম্মেলনে উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতা, এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের মতো বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠে। বান্দুং সম্মেলনকেই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেডে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী দশকগুলিতে কায়রো, লুসাকা, আলজিয়ার্স, কলম্বো ও দিল্লির মতো শহরগুলিতে একের পর এক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজিত হয়ে আন্দোলনকে প্রসারিত করে।
সার্বিকভাবে, জওহরলাল নেহেরুর উদ্যোগ, আদর্শিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক ফোরামে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৬৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আন্দোলনের গতি কিছুটা মন্থর হলেও এর সদস্যসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির এই আদর্শ বহু উন্নয়নশীল দেশের জন্য আজও পথপ্রদর্শক হিসেবে রয়ে গেছে।





