জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারতের ভূমিকা
ভারতের ভৌগোলিক আকার, অর্থনৈতিক শক্তি এবং কূটনৈতিক প্রভাব এটিকে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) একজন প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তৃতীয় বিশ্বের সংহতি গঠনে, বিশেষত নবস্বাধীন রাষ্ট্রগুলির মধ্যে, ভারতের ভূমিকা অপরিহার্য ছিল।
ভারতের জোট নিরপেক্ষ নীতির উৎপত্তি
এই নীতির শিকড় প্রোথিত ভারতের ঔপনিবেশিক অতীত ও স্বাধীনতার অহিংস সংগ্রামে। এর লক্ষ্য ছিল ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও সোভিয়েত কমিউনিজমের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। ‘জোট নিরপেক্ষতা’ পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহার করেন ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন ১৯৫৩ সালে জাতিসংঘে। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে কলম্বো ভাষণে পঞ্চশীলের পাঁচটি নীতি উপস্থাপন করেন, যা NAM-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে:
১. পরস্পরের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
২. পরস্পরের বিরুদ্ধে আগ্রাসন না করা
৩. পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা
৪. সমতা ও পারস্পরিক সুবিধা
৫. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
প্রতিষ্ঠাকালীন ভূমিকা
ভারত ১৯৬১ সালে বেলগ্রেডে NAM-এর প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম সংগঠক ছিল, যুগোস্লাভিয়ার টিটো ও মিশরের নাসেরের সাথে নেহেরু নেতৃত্ব দেন। এর আগে, ১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলনে ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ এশিয়া-আফ্রিকা জোট গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
১৯৮০-এর দশকে ভারতের নেতৃত্ব
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত NAM-এ পুনরায় সক্রিয় ভূমিকা নেয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। ১৯৮৩ সালে নয়াদিল্লিতে NAM শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে ভারত বৈশ্বিক অসমতা, নিরস্ত্রীকরণ ও উত্তর-দক্ষিণ সংলাপের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময় ও সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জোট নিরপেক্ষতা নীতি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। ভারত আন্দোলনের লক্ষ্যকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বহুপাক্ষিকতাবাদ ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার দিকে নিয়ে যায়। জি-১৫ এর মতো গোষ্ঠীর মাধ্যমে ভারত উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে।
বর্তমান অবস্থান ও কৌশলগত স্বাধীনতা
বিংশ শতাব্দীতেও ভারত NAM-এর প্রতি আনুগত্য রেখেছে, যা তাকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ার পাশাপাশি আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলির সাথে ঐতিহাসিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সক্ষম করেছে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, টিকা কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও জাতিসংঘ সংস্কারের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে ভারত NAM-এর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চলেছে।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারতের ভূমিকা কেবল প্রতিষ্ঠাতাই নয়, নৈতিক নেতৃত্বদানকারী ও কৌশলগত নির্দেশক-এর। ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক বহুপাক্ষিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা পর্যন্ত NAM-এর বিবর্তনে ভারত একটি গতিশীল ও অভিযোজিত নীতির মাধ্যমে প্রভাব রেখে চলেছে, যা তার জাতীয় স্বার্থ ও বৈশ্বিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।





